শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশি মুহিত, হ্যামট্রামিক মেয়র নির্বাচনে ১২ ভোটে এগিয়ে • দেশে উচ্চশিক্ষিতদের ২৯ শতাংশ বেকার : আইএমএফ • সাবেক অতিরিক্ত সচিবের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে ছিল অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনে • বিতর্কের জেরে প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়াকে বরখাস্ত করলেন ট্রাম্প • ৭১ বছর পর আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে পাকিস্তান • রিমান্ড শেষে কারাগারে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা দেবাশীষ-গুলশান • সাভারে ইতালি প্রবাসী নিখোঁজ, দুই দিনেও মেলেনি খোঁজ • মিষ্টির শূন্য আসনে বিএনপির মনোনয়ন চান ৬৭ নারী • তাজমিন হত্যা : হোটেলকর্মী রাজুর বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা • ভারতের সঙ্গে সংলাপে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইবে বাংলাদেশ

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
৩৭টি বিতর্কিত ব্যালট গণনায় পাল্টে গেল ফলাফল

ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশি মুহিত, হ্যামট্রামিক মেয়র নির্বাচনে ১২ ভোটে এগিয়ে

ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশি মুহিত, হ্যামট্রামিক মেয়র নির্বাচনে ১২ ভোটে এগিয়ে

হ্যামট্রামিক মেয়র নির্বাচনে ১২ ভোটে এগিয়ে মুহিত মাহমুদ। ছবি-সংগৃহীত

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায় রচনার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুহিত মাহমুদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হ্যামট্রামিক সিটির মেয়র নির্বাচনে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর নতুন করে গণনা করা ৩৭টি বিতর্কিত ব্যালট বদলে দিয়েছে নির্বাচনের ভোটের হিসাব। প্রায় এক বছর আগে মাত্র ১১ ভোটে পিছিয়ে থাকা মুহিত মাহমুদ এখন বর্তমান মেয়র অ্যাডাম আলহারবির চেয়ে ১২ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন।

১৬ অক্টোবর শুক্রবার আদালতের নির্দেশে ওয়েইন কাউন্টি বোর্ড অব ক্যানভাসার্স বিতর্কিত ব্যালটগুলো গণনা করে। সংশোধিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে মুহিত মাহমুদ পেয়েছেন ২ হাজার ৮৯ ভোট এবং বর্তমান মেয়র অ্যাডাম আলহারবি পেয়েছেন ২ হাজার ৭৭ ভোট। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ডব্লিউডিআইভি ও ডব্লিউডব্লিউজে নতুন এই ফলাফল নিশ্চিত করেছে। তবে আইনি জটিলতার কারণে ফলাফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করা হয়নি।

আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মুহিত মাহমুদের অনুকূলে গেলে তিনি হবেন হ্যামট্রামিকের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র। এ অর্জন কেবল একজন প্রবাসী বাংলাদেশির ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসেও যুক্ত করবে নতুন অধ্যায়।

২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হ্যামট্রামিকের মেয়র নির্বাচনে অ্যাডাম আলহারবি মাত্র ১১ ভোটের ব্যবধানে মুহিত মাহমুদকে পরাজিত করেন। ভোট পুনর্গণনার পরও ওই ব্যবধান বহাল থাকায় আলহারবিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তিনি চলতি বছরের জানুয়ারিতে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

কিন্তু নির্বাচনের পরদিন নগরীর ক্লার্কের কার্যালয়ে ৩৭টি গণনার বাইরে থাকা ডাকযোগে দেওয়া ভোটের ব্যালট পাওয়া যায়। ব্যালটগুলোর সংরক্ষণ ও হস্তান্তরসংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ কারণে ওয়েইন কাউন্টির নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রথমে ব্যালটগুলো গণনায় অন্তর্ভুক্ত করেননি।

মুহিত মাহমুদ ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁর যুক্তি ছিল, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না।

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের একপর্যায়ে চলতি বছরের মার্চে মিশিগান কোর্ট অব আপিল আগের আদালতের সিদ্ধান্ত বাতিল করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্ন আদালতে পাঠান। এরপর ওয়েইন কাউন্টি সার্কিট কোর্টের বিচারক ক্যাথলিন ম্যাকার্থি বিতর্কিত ৩৭টি ব্যালট গণনার নির্দেশ দেন।

শুক্রবার সেই ব্যালট গণনার পর মুহিত মাহমুদের অনুকূলে ভোটের ব্যবধান তৈরি হয়। ডব্লিউডিআইভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে গণনা করা ব্যালটগুলোর মধ্যে মুহিত পান ২৯ ভোট এবং আলহারবি পান ৬ ভোট। বাকি দুটি ব্যালট অন্যভাবে হিসাবভুক্ত হয়। সংশোধিত মোট হিসাবে মুহিত ১২ ভোটে এগিয়ে যান।

একসময় শিল্পকারখানানির্ভর অভিবাসী শহর হিসেবে পরিচিত হ্যামট্রামিক আজ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বসতি। ডেট্রয়েট নগরীর ভেতরে অবস্থিত ছোট এই শহরে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশি অভিবাসীরা ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন।

অভিবাসীদের প্রথম প্রজন্ম যেখানে জীবিকা ও পরিবার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বেশি মনোযোগী ছিল, সেখানে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা নগর প্রশাসন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়িত্বেও এগিয়ে এসেছেন। মুহিত মাহমুদের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেই দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রযাত্রারই ধারাবাহিকতা।

হ্যামট্রামিক এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পায়। ২০২১ সালের নির্বাচনে ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত আমের গালিব শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। একই সময়ে নগর পরিষদেও মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে শহরের মেয়র পদে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউকে নির্বাচিত করার ঘটনা হবে প্রথম। মার্কিন গণমাধ্যম ডব্লিউডিইটি ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগেই মুহিত মাহমুদের প্রার্থিতাকে এই ঐতিহাসিক সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছিল।

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়ে আসা মুহিত মাহমুদ দীর্ঘদিন ধরে মিশিগানে বসবাস করছেন। ২০০০ সালে মিশিগানে আসার পর তিনি পড়াশোনা, কর্মজীবন ও কমিউনিটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।

বাংলাদেশে ইসলামি ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা করা মুহিত যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি এমজিএম গ্র্যান্ড ক্যাসিনোতে কাজ করেছেন এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

২০২২ সালে তিনি হ্যামট্রামিক সিটি কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নগর প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২৫ সালে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনী প্রচারে স্থানীয় সড়ক ও অবকাঠামোর উন্নয়ন, সম্পত্তিকর, পানির বিল এবং নাগরিক সেবার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল।

ভোটের হিসাবে এগিয়ে গেলেও মুহিত মাহমুদের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ এখনো নিশ্চিত নয়।

বর্তমান মেয়র অ্যাডাম আলহারবি নতুন ফলাফল মেনে পরাজয় স্বীকার করেননি। তাঁর আইনজীবী নাবিহ আয়াদ জানিয়েছেন, বিতর্কিত ব্যালটগুলোর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়ে আইনি আপত্তি অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনে পুনর্গণনাসহ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও তাঁদের বিবেচনায় রয়েছে।

এ ছাড়া মুহিত মাহমুদের বসবাসের ঠিকানা নিয়েও বিরোধ রয়েছে। আলহারবির পক্ষের দাবি, মুহিত প্রকৃতপক্ষে হ্যামট্রামিকের পরিবর্তে মিশিগানের ট্রয় শহরে বসবাস করেন। ফলে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রয়োজনীয় আবাসিক যোগ্যতা তিনি পূরণ করেছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তবে মুহিত মাহমুদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি হ্যামট্রামিকের বৈধ বাসিন্দা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সব যোগ্যতা পূরণ করেন।

আগামী ২২ অক্টোবর ওয়েইন কাউন্টি সার্কিট কোর্টে আবাসিক যোগ্যতা-সংক্রান্ত মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত সংশোধিত নির্বাচনী ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করা যাবে না। এর মধ্যে আলহারবিই মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

মুহিত মাহমুদের এই অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অভিবাসীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ। নিউইয়র্ক, মিশিগানসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশিরা এখন কেবল ভোটার বা নির্বাচনী প্রচারের কর্মী হিসেবেই নন, নিজেরাও জনপ্রতিনিধিত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিচ্ছেন।

হ্যামট্রামিকের এই নির্বাচন দেখিয়েছে, স্থানীয় রাজনীতিতে অল্পসংখ্যক ভোটও কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ভোটের সঠিক গণনা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং আদালতের মাধ্যমে ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন প্রার্থী হিসেবে মুহিত মাহমুদের ১২ ভোটে এগিয়ে থাকা তাই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। তবে চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তির আগে তাঁকে নির্বাচিত মেয়র ঘোষণা করার সুযোগ নেই।

একসময় যে শহরে বাংলাদেশিরা অভিবাসী হিসেবে নতুন জীবন গড়তে এসেছিলেন, সেই শহরের সর্বোচ্চ নির্বাচিত নেতৃত্বের আসনে এখন একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীর নাম উঠে এসেছে। আদালতের চূড়ান্ত রায় অনুকূলে এলে এটি হবে হ্যামট্রামিকের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়—আর আমেরিকায় বাংলাদেশিদের মূলধারার রাজনীতিতে অগ্রযাত্রার একটি স্মরণীয় মাইলফলক।

ঠিকানা/শই



 

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz